|
নিয়ন্ত্রন করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, কলারোয়া নতুনপে-স্কেলে বেতন, প্রায় ৮ লাখ টাকা ঘুষ আদায়
আজকের কলারোয়া -
14/04/2016
কলারোয়া উপজেলা প্রথমিক শিক্ষা অফিসে চলছে ঘুষের রাজত্ব। ঘুষ না দিলে কোন ফাইল সই বা কাগজ দেন না উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কতিপয় নেতা, ক্ষমতাশীন দলের সমর্থিত কয়েকজন প্রাথমিক শিক্ষক এবং উপজেলার একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। আর এ কারনে জিম্মি হয়ে পড়েছে উপজেলার ১২৭টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ কর্মচারীরা। সরকার ঘোষিত নতুন পে-স্কেলে বেতন দেয়ার সময় তাদের কাছ থেকে ৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে আদায় করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এমন অভিযোগ করেছেন উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এছাড়া ঘুষ না দেয়ায় সরকার ঘোষিত বৈশাখী ভাতা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাদেরকে এখনও দেয়া হয়নি। আবার অনেক শিক্ষক তাদের নির্ধরিত ঘুষের টাকা দিয়েও নতুন পে-স্কেলে বেতন পায়নি। ফলে তারা বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলে জানাগেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, কয়েকটি স্কুল ঘুরে এক তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলারোয়া উপজেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা হিসাব রক্ষন অফিসে টাকা না দেওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনার পরেও এরিয়া বিলসহ উপজেলার ১২৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২৭ জন প্রধান শিক্ষক ও নতুন জাতীয়করণ হওয়া সহকারী শিক্ষকরা এখনও নতুন পে-স্কেলে বেতন উঠাতে পারেননি। এদিকে তাড়াতাড়ি বিল তৈরী করার জন্য শিক্ষা অফিস বাবদ উপজেলার ১২৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৩৭ জন শিক্ষকের নিকট থেকে ৪০০ টাকা করে ২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮০০ টাকা ঘুষ আদায় করা করেছে। এ ছাড়া নব্য সরকারী ৬০টি স্কুলের ২২৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৪ জন সহকারী শিক্ষকদের নিকট থেকে যাদের তিনটি টাইম স্কেল তাদের নিকট থেকে ৩ হাজার টাকা, যাদের ২টি টাইম স্কেল তাদের নিকট থেকে ২ হাজার ৫’শত টাকা এবং যাদের ১ টি টাইম স্কেল তাদের নিকট থেকে ১ হাজার ৫’শ টাকা করে ২ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা এবং নব্য সরকারী ৪৭ জন প্রধান শিক্ষককের নিকট থেকে টাইম স্কেলের একটি কাগজে সিল স্বাক্ষর করা বাবদ স্বয়ং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ৫ হাজার টাকা করে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা গ্রহন করাসহ মোট ৭ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহন করা করেছেন। কলারোয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকবার হোসেনের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট চক্র এই ঘুষের টাকা তুলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এছাড়া সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে যারা ঘুষ দেওয়ার পরেও এখনও নতুন পে-স্কেলের বেতন উত্তোলন করতে পােির নাই তারা ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন, আমরা তাদের চাহিদা মত টাকা দিয়েছি কিন্তু এখনও আমাদের এখনও নতুন স্কেলে বেতন তুলতে পারেনি।
উপজেলা শিক্ষক সমিতির একটি সুত্র জানায়, বেতন বিল তৈরী অর্থাৎ ফিকসেশন করার জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আকবার হোসেনের নেতৃত্বে শিক্ষক সমিতির সভাপতি রবিউল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল্লাহ ১২৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৩৭ জন শিক্ষকের নিকট থেকে ৪০০ টাকা করে ২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করেছে। এসব টাকার সিংগভাগই উপজেলা শিক্ষা অফিসারের পকেটে।
এছাড়া উপজেলার নতুন জাতীয়করণ হওয়া ৬০টি স্কুল থেকে ১০৪ জন শিক্ষকের নিকট থেকে এরিয়া বিল, টাইম স্কেল ও বেতন সমন্বয় বাবদ ২ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা উৎকোচ হিসেবে আদায় করা হয়েছে। আর এ টাকাও উপজেলা শিক্ষা অফিসার আকবর হোসেনের নেতৃত্বে আদায় করেন উপজেলার খাসপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালযের শিক্ষক মাহবুব হোসেন,চক জয়নগর স্কুলের শিক্ষক কুদ্দুস ও তালুন্দিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ওবায়দুর রহমান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকবর হোসেন জানান, বেশ কিছু শিক্ষকের কাগজে ভুল এবং তার অফিসে জনবল কম থাকায় বিল দিতে বিলম্ব হচ্ছে। ইতোমধ্যে আগের সরকারী স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের বিল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নব্য সরকারী শিক্ষকদের বিল আগামী সপ্তাহে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে টাকা বা ঘুষ উঠানোর ব্যাপারে তিনি কিছই জানেন না বলে জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক প্রধান শিক্ষক নুরুল্লাহ নতুন পে-স্কেলের ফিকসেশন বাবদ অর্থাৎ বিল তৈরী করার জন্য শিক্ষক প্রতি ৪০০ টাকা নেয়ার ঘটনার সত্যত্য স্বীকার করেছেন। তবে তারা দাবি করে বলেন, এই টাকা আদায় করা হয়নি। স্ব-স্ব শিক্ষকরা নিজ দায়িত্বে শিক্ষা অফিসে জমা দিয়েছেন।
নতুন জাতীয়করণ হওয়া ৬০টি স্কুল থেকে ১০৪ জন শিক্ষকের নিকট থেকে ঘুষ বাবদ ২ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা আদায়কারী ওই ৩ শিক্ষক এরিয়া বিল, টাইম স্কেল ও বেতন সমন্বয় বাবদ টাকা আদায় করার কথা স্বিকার করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নব্য সরকারী একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান,উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাদের ৪৭ জন প্রধান শিক্ষকের টাইম স্কেলের আবেদনে সুপারিশ করা বাবদ আবেদন প্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা উৎকোচ হিসেবে গ্রহন করেছেন।
উপজেলা হিসাব রক্ষক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, তিনি সহ তার অফিসের কোন কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোন টাকা ঘুষ বাবদ চাওয়া হয়নি। কারণ এটা তারসহ তার অফিসের কর্মকর্তাদের অফিশিয়াল দায়িত্ব ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একাধিক সাধারণ শিক্ষকরা জানায়,উত্তোলনকৃত টাকার কিছু অংশ হিসাব রক্ষক অফিসে, কিছু অংশ আদায় কারী শিক্ষকরা আর বাকি টাকা সবই প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের পকেটে। ফলে তারা নতুন পে-স্কেলে এরিয়াসহ বেতন পেতে হয়রানীর শিক্ষার হচ্ছে। তারা অভিযোগ আকারে আরো জানান,টাকা না দিলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আকবার হোসেন ও হিসাব রক্ষক অফিসার নজরুল ইসলাম কোন কাজ করেন না। তারা আরো জানান, উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ শিক্ষক নেতারা প্রায় সময় বিভিন্ন অজুহাতে তাদের নিকট থেকে উৎকোচ আদায় করেন। এটা তাদের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী রাকিবুল ইসলাম রকিব উপজেলার ৬৩৭ জন শিক্ষকের নিকট থেকে ৪০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে স্বীকার করে জানান, শিক্ষক নেতাদের বাড়ি দুরে হওয়ায় শিক্ষা অফিসার স্যারের নির্দেশে সব শিক্ষকরা তার কাছে এই টাকা জমা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে কলারোয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মখর্তা আকবার হোসেন এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ঘুষের টাকা ফেরত, এবং শিক্ষা কর্মকর্তাসহ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ান জন্য মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী, শিক্ষা সচিব, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, কলারোয়া উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন শিক্ষকরা।
|